সামান্য সেলাই করতে আসা অসহায় রোগীদেরকে জিম্মি করে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা, উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ
সত্যখবর ডেস্ক ॥ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছ থেকে সেলাই ও চিকিৎসাসেবার নামে ৬ হাজার, ৮ হাজার এমনকি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত রাজন টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং তার দাবি, দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মিলে শিফট অনুযায়ী ওই টাকা ভাগ করে নেন। বৃহস্পতিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ত্রিমোহনী এলাকার একটি থাইগ্লাসের শোরুমে কাজ করার সময় হাত কেটে আহত হন এক কর্মচারী। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। ভুক্তভোগী রোগীর অভিযোগ, হাসপাতালে যাওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর তার চিকিৎসা শুরু হয়। প্রথমে তার কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে ৬ হাজার টাকায় সমঝোতা হলে তার হাতের সেলাইয়ের কাজ শুরু করা হয়। রোগীর সঙ্গে থাকা থাইগ্লাস দোকানের মালিক আশরাফুল বলেন, রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর দায়িত্বে থাকা একজন তাকে এবং অন্য এক রোগীর স্বজনকে আলাদা একটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে অন্য রোগীর স্বজনকে বলা হয়, তার রোগীর কাজ করতে ৫ হাজার টাকা লাগবে। পরে আমাকে একটি স্লিপ দিয়ে বলা হয়, স্লিপে থাকা ওষুধগুলো বাইরে থেকে কিনে আনলে শুধু ৩ হাজার টাকা ‘ওটি চার্জ’ দিতে হবে। আর হাসপাতাল থেকে সবকিছু দেওয়া হলে ৮ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়। আশরাফুলের ভাষ্য, ঝামেলা এড়াতে ও রোগীর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ রোধে তিনি সাড়ে ৫ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। পরে ৬ হাজার টাকা দাবি করা হলে তাতেও রাজি হয়ে প্রথমে হাতে থাকা ২ হাজার ৫০০ টাকা দেন। রোগীর কাজ শেষ হওয়ার পর বাকি ৩ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করে রোগীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে যান। অভিযোগের সত্যতা জানতে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত রাজনের সঙ্গে কথা বলা হলে প্রথমে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ভুল হয়ে গেছে।’ টাকা কারা ভাগ করে নেন জানতে চাইলে তিনি হাবিব, রনি, আসাদ, সাহেদসহ ৭-৮ জন। তার দাবি, যে শিফটে যারা দায়িত্বে থাকেন, তারা ওই টাকা ভাগ করে নেন। শুধু এই একজন রোগী নয়, হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী। তাদের অভিযোগ, দিনের পর দিন বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রোগী ও স্বজনদের অনেকটা জিম্মি করে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে এসে অনেক সাধারণ মানুষকে বেসরকারি হাসপাতালের মতোই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা এক ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, হাসপাতালে সামান্য চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষায়, ‘প্রতিনিয়তই রোগীদের কাছ থেকে এভাবে টাকা নেওয়া হচ্ছে।’ এদিকে অভিযোগের বিষয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মোঃ ইকবাল হাসানের বক্তব্য জানতে তার কক্ষে গেলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। এ ধরনের অভিযোগ আমিও শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলেই তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, বিষয়টি বর্তমানে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দেখছেন। তিনি বর্তমানে উপজেলা হাসপাতালের দায়িত্বে রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন বলেও জানান। তবে প্রশ্ন উঠছে, জরুরি বিভাগে যদি সত্যিই রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসার নামে নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধে কার্যকর নজরদারি কতটা হয়েছে? আরও প্রশ্ন, হাসপাতালের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অগোচরে এসব ঘটছে, নাকি অভিযোগগুলো তাদের নজরে আসার পরও যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরে একটি ‘টাকা নেওয়ার সংস্কৃতি’ তৈরি হয়ে থাকলে এর দায় শুধু একজন কর্মচারীর ওপর দিয়ে শেষ করা যায় না। এমনকি হাসপাতালের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত বলেও প্রশ্নও তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সরকারি ফি আত্মসাৎ বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং কঠোর মনিটরিংয়ের কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা বাড়ানোর নির্দেশনার কথাও বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন, সেই নজরদারি ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মধ্যেই যদি জরুরি বিভাগে রোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে অভিযোগগুলোর তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে হয়- সেদিকেই তাকিয়ে ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষ।
মন্তব্য করুন