কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্পের (আরআরএমইপি) আওতায় ১৩০ জন নারী কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র নারীদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন আদিবাসী নেতার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার এবং প্রকৌশল অফিসের যোগসাজশে এসব টাকা নেওয়া হয়েছে। চাকরির আশায় কেউ কেউ ছাগল বিক্রি করেও টাকা দিয়েছেন। যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে রয়েছে অসঙ্গতি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জায়গায় দেওয়া হয়েছে নিয়োগ পত্র।
অন্যদিকে, নিয়োগসংক্রান্ত চিঠি ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে পৌঁছানো এবং প্রচার-প্রচারণা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ১৮ অক্টোবর চিঠি ইস্যু করা হলেও কোনো কোনো ইউনিয়ন পরিষদ তা পেয়েছে ২৬ অক্টোবর। অথচ আবেদন জমার শেষ দিন ২৮ অক্টোবর। পরদিন, ২৯ অক্টোবর লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত নিয়োগের কথা রয়েছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাসময়ে সবাইকে অবহিত করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ১০ জন করে মোট ১৩০ জন নারী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। সহায়-সম্বলহীন, দুস্থ, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা এবং পরিবারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দরিদ্র নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে।
আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। তাকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং শারীরিকভাবে কায়িক শ্রমে সক্ষম হতে হবে। নিজস্ব বসতভিটা ও জমির পরিমাণ ০ দশমিক ৫ একরের বেশি হওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দা হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচিত সড়কের দুই কিলোমিটারের মধ্যে বাড়ি থাকতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৯ থেকে ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের মধ্যে উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের সপ্তাহে ছয়দিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে হবে। দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা। এর পাশাপাশি বাধ্যতামূলক সঞ্চয় হিসেবে প্রতিদিন ১০০ টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হবে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। আবেদন জমা দেওয়ার জন্য কোনো ভাতা দেওয়ার কথাও নেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আদিবাসী নেতা অসিত, সুকুমার ও গুলপা চাকরি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে রাতুলপাড়া এলাকার রানু, হ্যামেলা, লিপি, নিমরি ও নিশিসহ একাধিক নারীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিযুক্তদের একজন অসিত।
উপজেলা প্রকৌশলীও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। অন্যদিকে, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী অভিযোগকে ভুল তথ্য বলে দাবি করেন।
চাকরির আশায় টাকা দেওয়ার অভিযোগ করা হ্যামেলা দাসীর স্বামী লক্ষণ দাস বলেন, দুটি ছাগল বিক্রি করে আদিবাসী নেতাদের হাতে ১৫ হাজার টাকা দিয়েছি। তারা নিয়োগের বিষয়ে পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন।
আরেক ভুক্তভোগী নারী সাহিদা বলেন, আমরা গরিব মানুষ। দীর্ঘ মেয়াদে একটা চাকরি হলে পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারব। তাই অনেক কষ্টে ১০ হাজার টাকা জোগাড় করে তাদের দিয়েছি। তারা বলেছেন- ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলে আমার নিয়োগ চূড়ান্ত করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগের আবেদনপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই চাকরি নিশ্চিত করার কথা বলে এসব টাকা নেওয়া হয়েছে। ফলে লটারির মাধ্যমে নিয়োগের ঘোষণা থাকলেও তাদের মধ্যে টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল।
কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, তার এলাকায় তিনজন আদিবাসী নেতা চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি তিনি উপজেলা প্রকৌশলীকে জানিয়েছেন।
আনিসুর রহমান আরও বলেন, তিনজন আদিবাসী নেতা অসিত, সুকুমার ও গুলপা আমার এলাকা থেকে ইঞ্জিনিয়ারের নাম করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন।
চিঠি পৌঁছাতে দেরি হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ১৮ অক্টোবর ইস্যু করা চিঠি তিনি ২৬ অক্টোবর পেয়েছেন। অথচ আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৮ অক্টোবর।
হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম মুশতাক হোসেন মাসুদ বলেন, আমরা কোনো চিঠি পাইনি। অনলাইনের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চলছে। আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদে ২৬ অক্টোবর চিঠি পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেন চেয়ারম্যান।
ইউনিয়ন পরিষদে যথাসময়ে চিঠি না পৌঁছানো এবং অল্প সময়ের মধ্যে আবেদন শেষ করার বিষয়টি নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রচার ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, টাকা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ এবং নিয়োগের আগে বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি বলে মনে করে সচেতন মহল। বিশেষ করে, যারা চাকরির আশায় ধারদেনা করেছেন কিংবা ছাগল বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন, তাদের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে।
অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে আদিবাসী নেতা অসিত বলেন, টাকা নেওয়ার প্রমাণ করতে পারলে আমি নাকে খত দেব। আমি আমার ভাবির জন্য চেষ্টা করছি। আমার ভাবির নাম বিউটি।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী রোশান আহমেদ বলেন, অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। আমার কাছে অভিযোগ এসেছে, আদিবাসী নেতারা প্রলোভন দেখিয়ে টাকা নিচ্ছেন। লটারির মাধ্যমে উপযুক্ত মানুষকেই নিয়োগ দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ বলেন, এমন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনারা ভুল তথ্য পেয়েছেন।
মন্তব্য করুন