নলকোলা ও সবুলপুর গ্রাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড অর্ন্তগত। গ্রামের মসজিদ ও কবরস্থান কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে গত প্রায় এক মাস ধরে এই গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের মত ঘটনা চলমান রয়েছে। গ্রামবাসীর অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিস্ক্রিয় ভূমিকায় থাকায় কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না চলমাস সহিংসতা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নলকোলা গ্রামের মৃত কলিম উদ্দিন মুন্সীর কনিষ্ঠ পুত্র আব্দুর রহমান ইউনিয়ন কৃষকদলের আহ্বায়ক হওয়ার পর থেকে এলকায় তার প্রভাব বিস্তার করার জন্য তার অপর ভাই খলিলুর রহমানের ডেকোরেটরের দোকানে জেলা বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের ব্যানার ও ফেস্টুন ঝুলিয়ে ইউনিয়ন কৃষকদলের অসিফ খুলে বসেন। যদিও এই অফিস আনুষ্ঠানিক ভাবে জেলা পর্যায়ের কোন নেতা উদ্বোধন করেনি বলেও এলাকাবাসী নিশ্চিত করেছেন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, আব্দুর রহমানের বসবাস কুষ্টিয়া শহরে হলেও ইউনিয়ন কৃষকদলের পদ পাওয়ার পর থেকে তিনি মাঝে মাঝে নিজ গ্রামে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের পদধারী নেতা নিয়ে ঐ অফিসে বসতেন। যার মধ্যে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুন্সি এনামুল হক, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম লাল্টু ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য জুলফিকার আলী পল্টুর নাম রয়েছে।
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের এসব নেতাদের নিয়ে বিশাল বাহিনী গড়ে তুলে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে কৃষকদলের এই নেতা। আর এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আবু দাউদ, আইলচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুন্সী রবিউল ইসলাম ও আলাউদ্দিন মাস্টার।
উল্লেখ্য, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামে গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে বিএনপির সহযোগী সংগঠন কৃষকদলের অফিসে হামল ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ওই হামলার জন্য তাৎক্ষনিক ভাবে দায়ী করা হয় যুবলীগ নেতাকর্মীদের। ঘটনার পরই এক যুবলীগ নেতার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুরের পাশাপাশি গুদামে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনার একদিন পর (১৬ সেপ্টেম্বর) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানায় ৭৫জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১২০জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যাক্তি বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ নেতাদের পাশাপাশি আসামী করা হয়েছে শ্রমিকদলের প্রায় একডজন নেতাকে।

কৃষকদলের অফিসের হামলা-ভাংচুরের ঘটনায় মামলার পর এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার পুরাতন সামাজিক দলাদলিকে কেন্দ্র করে মামলায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও ক্ষমতাসীন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের প্রায় একডজনের বেশি নেতাকর্মী ফ্যাসিষ্ট দেখিয়ে আসামী করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আব্দুর রহমানের ভাই খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে আলম ফকিরের ছেলেকে মারধর করা সহ তার নিকট থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। যা পরবর্তিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এছাড়াও এই ঘঁনাকে কেন্দ্র করে নলকোলা গ্রামের স্টীল ব্রিজ পাড়ার ইমান আলী, রফিকুল, মনিরউদ্দিন, ক্যানাল পাড়ার সাবান আলী, তোফান আলী, স্কুল পাড়ার আরশেদ, গোরস্থান পাড়ার জাহাঙ্গীর, সুজনের বাড়ীসহ প্রায় ২১ বাড়ি ভাংচুরের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন কৃষকদলের আহ্বায়ক আব্দুর রহমানের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
অপরদিকে, বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নলকোলা গ্রামের মৃত সেলিম আহমেদের স্ত্রী নূর জাহান ৬২ জনকে বাদী করে এবং আরও ১৫/২০ জনকে অজ্ঞাতনামা অসামী করে কুষ্টিয়ার বিজ্ঞ সিনিয়ন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মামলা করেন এবং মনির উদ্দিন মোল্লার পুত্র শাহাঙ্গীর বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাদী হয়ে ৭৯ জনকে অসামী করে কুষ্টিয়ার বিজ্ঞ সিনিয়ন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে অপর মামলাটি দায়ের করেন। মামলা দুইটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কুষ্টিয়া শখার অধিনে তদন্তাধীন বয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার প্রায় ২৫ দিন পর গত শনিবার (১০ অক্টোবর) নলকোলা গ্রামের মৃত মাহের মন্ডলের ছেলে মনির উদ্দিনের দোকানের টিনের চালা কেটে লুটপাট হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও গত সোমবার (১২ অক্টোবর) টিপু ডাক্তারের বাঁশ বাগান থেকে বাঁশ কেটে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
দোকান লুটপাটের ঘটনা জানতে চাইলে ইবি থানার অফিসার ইনচার্জ এস এম মামুনুর রমীদ বলেন, সার্বিক বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। অভিযোগ পেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিবো।
হাবিবুর রহমানের দায়ের করা মামলার ৯ নম্বর আসামী জহরুল ইসলাম জহির। তিনি পাটিকাবাড়ি ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিকদলের সভাপতি। ৬৫ বছর বয়সী জহির মামলার আসামী হওয়ার খবর শুনে আকাশ থেকে পড়েন।
ঘটনার দিনকার বর্ণনা দিয়ে জহির জানান , ওই সময় তিনি নামাজের জন্য মসজিদে ছিলেন। নামাজ শেষ করে তিনি এসে দেখেন কৃষকদলের অফিসে হামলা হয়েছে। ভাংচুর করা হয়েছে আসবাবপত্র। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া, শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার ছবি। হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়। তবে কারা হামলা করেছে তা তিনি নিজে দেখেননি। পরে শুনতে পান তাকেও আসামী করা হয়েছে।
জহির বলেন, গ্রামে দলাদলি আছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দ্বন্দ্ব বাড়ছে। আমি নামাজে থেকেও আসামী। বিএনপির রাজনীতি করার পরও আসামী করা হয়েছে। শুধু আমাকে নয় বিএনপি রাজনীতি করে এমন ২০ থেকে ২৫জনকে আসামী করা হয়েছে।
জহিরের মত মামলায় আসামী হয়েছেন ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়া আলী, শ্রমিক দলের সদস্য শাহিন আলী, আছানুর আলী, সহ যুগ্ম সম্পাদক আরশেদ আলী, রিপন আলী, ইয়ার আলী, জিয়ার আলী, ইজিবার আলী, সদর উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাহাঙ্গীর আলম সুজন, ইনিয়ন শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি পলাশ হোসেন, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক আয়ুব আলী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিকদল নেতা বলেন, সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। অনেকেই নির্বাচন করতে চান। এলাকায় সামাজিক গ্রুপ রয়েছে। কৃষকদলের অফিস ভাঙ্গার ঘটনা পুঁজি করে বিএনপির লোকজনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব আবু দাউদ তার লোকজনকে দিয়ে মিথ্যা মামলায় দলের লোকজনকে আসামী করেছে।
এসব বিষযে জানতে চাইলে জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু দাউদ জানান, এগুলো আমার নলেজে নাই।
পাটিকাবাড়ি ইউনিয়ন কৃষক দলের আহবায়ক আব্দুর রহমান জানান, মারামারি হতে ছিল একজন আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে মোবাইলে ভিডিও করতে ছিল, তাই তার মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। পরে আবার মোবাইল ফেরত দেওয়া হয়। ১৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে এলাকা শান্ত রয়েছে। আমি এখন মিটিংয়ে আছি বলে ফোনটি কেটে দেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন বলেন, আমরা খোঁজ খবর নিয়ে যদি এই বিষয়ে বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের কোন নেতা-কর্মির সর্ম্পক্ততা পায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
মন্তব্য করুন