• 07:15:52 PM | Sunday, March 15, 2026
Bongosoft Ltd.

সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীর


FavIcon
Daily Satto Khobor
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 1, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন:
Share:
ad728

ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, ‘সত্য বলার স্বাধীনতা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর ও শোভন জিনিস।’ কিন্তু এ কথাও ঠিক, সত্য নিরাভরণ বটে; কিন্তু তার চলার পথ মোটেই পাপড়ি বিছানো নয়। সহজ, সরল, স্বাভাবিক সত্য তাই, ‘সত্য যে কঠিন’।

এই কঠিন সত্যকে সমগ্র সত্তা নিয়ে ধারণ করে, অন্তরস্থ করে, সকল প্রকার ভ্রুকুটি, কণ্টক, কাঁকর ও বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে, অভিযানপ্রিয় সিন্দাবাদের মতো সত্যের সন্ধানে অবিরাম অবিশ্রাম প্রয়াস চালিয়ে গেছেন যে মহাপ্রাণ, স্বপ্নবান কর্মবীর তিনিই বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাবুল। তিনি শুধু সত্য সন্ধানী ছিলেন তা নয়। নিজের পুরো জীবনটা যেমন তিনি এই দুর্গম পথে উৎসর্গ করে গেছেন, তেমনই অন্যদেরও যেন জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ভাষায় শুনিয়ে গেছেন অভয়বাণী-

‘সত্য পথের তীর্থ পথিক ভয় নাই নাহি ভয়,

শান্তি যাদের লক্ষ্য, তাদের নাই নাই পরাজয়।’

আজ যুগান্তরের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

অন্তরে লালন করা দেশগড়ার ব্রত, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ থেকে নিজের মেধা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস থেকে তিনি গড়ে গেছেন বিশাল এক শিল্পসাম্রাজ্য-‘যমুনা গ্রুপ’। এই যমুনা এমন এক গৌরবের প্রতিষ্ঠান, যার একটি টাকাও কোথাও ঋণ নেই। এই গ্রুপ থেকে কানাকড়িও পাচার হয়নি বিদেশে। নিজের পুরো শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে দেশকে করেছেন শিল্পসুষমামণ্ডিত। সৃষ্টি করেছেন হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান।

জীবনের এমন এক কর্মমুখর, ঊর্মিমুখর সময়ে এই মানুষটি অনুভব করছিলেন-সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার মতো গণমাধ্যমের নিদারুণ অভাব। বাক, ব্যক্তি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ভয়াবহরকমভাবে সংকুচিত, সীমিত। এই দুঃসহ অভাব দূর করার বাসনা নিয়ে দেশ ও জনগণের প্রতি অসীম ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে, ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা নিয়ে হাত বাড়ালেন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার দিকে।

প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন এমন এক গণমাধ্যম, যা কোনো বিশেষ দলের দাসত্ব করবে না। কোনো অবস্থায়ই কারও ইচ্ছা পূরণের হাতিয়াররূপে ব্যবহৃত হবে না।

লক্ষ্য শুধু একটাই-হাওড়ের কুমিরের ঢেউয়ের বিরুদ্ধে যে লড়বে মাতৃভূমির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। নিজের দেশ ও জনগণের স্বার্থরক্ষার শপথ ছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের রক্তে ও আত্মায় অন্য কোনো অভিলাষ থাকবে না।

যে শপথের দীপ্ত আগুন বুকে নিয়ে একদিন নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে স্বাধীনতার জন্য, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে-সেই চেতনার আলো ও উত্তাপ ছড়িয়ে দিতেই প্রকাশ করেছিলেন দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভির মতো দুই-দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ শক্তিশালী গণমাধ্যম।

এই স্বপ্নসারথি কি ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা ছিলেন? নিখাদ দেশপ্রেম জাতির প্রতি কর্তব্যবোধ, বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার দুর্দান্ত সংবেদনশীলতা ও বিচক্ষণতা দিয়ে তিনি যেন সময়ের চাহিদা ও প্রত্যাশাকে মর্মে মর্মে অনুধাবন করেছিলেন।

অচিরকালের মধ্যেই তার দূরদর্শিতা যে অভ্রান্ত, তা প্রমাণিত হয়ে গেল। বিগত পতিত ফ্যাসিবাদের দুঃশাসনে, লোভ ও ভয়ের কাছে যখন দেশের বেশির ভাগ গণমাধ্যম আত্মসমর্পণ করল, পদলেহন ও স্তুতি বাণিজ্যকে বানাল হাতিয়ার, সে ইতর সময়ে যে পত্রিকা শিরদাঁড়া সোজা করে চলেছে, ভয় ও লোভের জন্য হীন স্বার্থের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়নি, আর এই দেয়নি বলেই হয়ে উঠেছিল জনতার কণ্ঠ, যার গায়ে-গতরে কোথাও দালালির সামান্য চিহ্ন পর্যন্ত নেই, সেই পত্রিকাই তো যুগান্তর।

আফগানিস্তানের জাতীয় কবি খুশহাল খান খটক বলেছিলেন, ‘গোলামি নহি শিওয়ায়ে আফগান’ (আফগান জাতির ললাটে গোলামির দাগ নেই।-একইরকম তেজোদীপ্ত কণ্ঠে আজ আমরাও গর্ব করে বলতে পারি, যুগান্তরের ললাটে গোলামি বা দালালির সামান্য চিহ্নটুকুও নেই। এ কারণেই যুগান্তর জয় করেছে জনহৃদয়। হয়ে উঠেছে পাঠকের আত্মার আত্মা। এই আপসহীনতার জন্যই পাঠক আজ বিশ্বাস করে যুগান্তরকে। যুগান্তরের ভারসাম্যপূর্ণ নীতির জন্যই তারা দৃঢ় আস্থা রাখেন এই পত্রিকাটির প্রতি।

যে পতাকা, যে পথচলার নির্দেশনা, যে অনির্বাণ চেতনা সঞ্চার করে গেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমাদের মধ্যে, সেই পথ ধরেই আজও নির্বিরাম চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যুগান্তর। আজ যুগান্তর মানেই যেন মাথা নত না করার এক অনবদ্য উপাখ্যান।

আমরা যারা মাঠে কাজ করি, তাদের কখনো হয়তো ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়-সেই ঘনায়মান ক্রান্তিতে আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, আমাদের পরিচালকমণ্ডলী মনে করিয়ে দেন মরহুম চেয়ারম্যানের নির্দেশনার কথা।

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বপ্নসারথির আত্মার অস্তিত্ব অনুভব করি-যুগান্তরের সর্বত্র। অনুভব করি তার বিদেহী আত্মা যেন দূরে থেকেও আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে। আমরা ভালো কিছু করতে পারলে যেন ওপারে থেকেও তিনি খুশি হন। ভুল করলে যেন তার আত্মাকে কষ্ট দেওয়া হয়। সেই কারণে আমরা তার চেতনাকে আমাদের দিকনির্দেশক কম্পাস, আলোকিত বাতিঘরের মতো মনে করি। আর নিজেরা নিজের কাছেই অঙ্গীকারবদ্ধ হই-তার স্বপ্নের সৌধের গায়ে আমাদের ভুলের জন্য যেন কোনো কালির আঁচড় না পড়ে। ফলে আমরা সব ক্লান্তি ও বিভ্রান্তি ভুলে আবার ফিরে আসি তারই স্বপ্নের কাছে। সত্য ও ন্যায়ের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যাই অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দিকে।

এখানে একটা আফসোসের কথা বলতে চাই, এদেশে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নানা পেশার গুণিজনকে স্বীকৃতি দেওয়া ও সম্মানিত করার জন্য রাষ্ট্রের রয়েছে স্বাধীনতা ও একুশে পদক। কিন্তু যারা শিল্পবিস্তার করেছেন, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন-তাদের যোগ্য সম্মান কখনোই দেওয়া হয় না। এদিকে নজর দেওয়া আজ সময়ের দাবি।

আজ যুগান্তর ২৭-এ পা রাখল। আমাদের দেশে যেখানে নদীর নাম কীর্তিনাশা, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় আয়ু নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর, সেখানে শ্বাপদ অরণ্যের ঘোর তমসা পেরিয়ে একটা পত্রিকার এতগুলো বছর পার হয়ে আসা চাট্টিখানি কথা নয়।

আনন্দ ও গৌরবের রেণুমাখা এই মধুময় সময়ে যুগান্তরের সব শ্রেণির পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, সার্কুলেশনের সঙ্গে জড়িত প্রতিজন হকার ও এজেন্টদের প্রতি জানাই হৃদয়ভরা শুভেচ্ছা ও গভীর ভালোবাসা। কারণ, যুগান্তরের সব আনন্দ-বেদনার সবচেয়ে বড় অংশীজন তো তারাই। তাদের সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরেই তো যুগান্তরের অবগাহন। তারাই আসলে যুগান্তরের প্রাণ ও প্রাচুর্য।